নিজের টাকায় আম্মুকে প্রথম ঈদের শপিং করে দেয়া

আমার ১০ বছরের কলেজ জীবনে এত্তবার স্টেজে উঠে প্রাইজ নিলাম, কোনদিন আমার পরিবারের কেউ বাবা, মা কিংবা ভাই জীবনেও দেখতে আসেন নি, আমাকে কোন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহ দেন নি, নিরুৎসাহও করেন নি।

কলেজ জীবনের শেষ সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মা বললেন যে, তিনি আসতে চান। আমার ফর্ম তখন তুঙ্গে, নিজের হাউজের টিম সামলিয়ে, দলীয় নাটক থেকে শুরু করে উপস্থিত বক্তৃতা – মাইক্রোফোনটা হাতে নেবার সাথে সাথে মনে হচ্ছিল যে, এই স্টেজ তো আমার জন্যই বানানো হয়েছে। সামনে যেন বিচারকরা বসে থাকতো আমাকে ফার্স্ট প্রাইজটা দেবার জন্য।

তারপর তারপর এভাবে অপ্রতিরোধ্যভাবেই সেবার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলাম। এরপর মাকে স্টেজে এনে, মাকে দিয়েই সচিব স্যারের কাছ থেকে প্রাইজটা নেয়ালাম। অথচ তার আগের দিনও কিন্তু আমার গলা ভাঙ্গা ছিলো। “মায়ের দোয়া”- শব্দটি এমনি এমনি আসে নি।

এই ঈদুল আজহার আগের দিন চাঁদ রাতে Syed Fahim রাত ১০ টায় কল করেছিলো Business Competition এর Product Promotion এর Strategy নিয়ে কথা বলার জন্য। আমি তখন আম্মুকে নিয়ে শপিংমলে তাকে জুতো কিনে দেব বলে, আমি আম্মুকে আগেই বলেছিলাম যে টাকা কোন সমস্যা না আমার কাছে। তুমি শুধু পছন্দ করো। আমি ফাহিমের সাথে কথা বলতে বলতেই খেয়াল করলাম, আমার মা একটা কাপড় ধরে অনেকক্ষন ধরে এটার গায়ে যে প্রাইজ ট্যাগটা আছে, সেখানে কত লেখা সেটা বোঝার চেষ্টা করেন। তারপরে রেখে দেন। (উল্লেখ্য যে, আমার আম্মুর বিয়ে হয়েছিলো ১৩ – ১৪ বছর বয়সে, পড়াশোনা করার সুযোগ হয় নি। আমরা চার ভাইরাই আম্মুকে ইংরেজী বাংলা পড়ালেখা শিখিয়েছি যতটুকু পেরেছি)

আমার ব্যাপারটা দেখে বেশ ভালোই অভিমান হলো, আমি ফাহিমকে ফোনে বললাম, “দোস্ত, আমি তোকে পরে কল করছি। আম্মুর সাথে শপিং শেষ করে নেই।”

সেলসপারসন হিসেবে একজন আপু ছিলেন আম্মুর সাথে Sailor এ, তাকে কাছে গিয়ে বললাম, “আমার আম্মু যেটা যেটা শুধু হাত দিয়ে টাচ করবেন, বের করারও দরকার নেই। জাস্ট হাত দিয়ে টাচ করলেই ওটা নিয়ে প্যাক করা শুরু করবেন।” উনি কিছুটা অবাক হয়ে হেসে বললেন, “শিওর স্যার”

ফলাফল হিসেবে আমার মাকে যখন কাঁচের দরজা খুলে বের করে নিয়ে আসছি, আমার হাতে তখন ব্যাগে ৩ জোড়া জুতো, ২ টা ওড়না, আরো কি কি যেন মেয়েদের কাপড় কে জানে। (আরো হতো, আমার মা যখন পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন, সাথে সাথে বের হয়ে গিয়েছেন) এরপর আমার আম্মা আমাকে সারা রাস্তা “অপচয়কারী”, “কুলাঙ্গার”, “রোবট” বলে বকতে বকতে নিয়ে আসলেন। এর মধ্যে আবার যে জুতোজোড়া আম্মুর সাইজে হয় নি, সেটা দিয়ে পারলে আম্মু বাসায় বসে আমাকে পিটান। সেদিনের রাতের খরচের জন্য এই বছর হয়তো ম্যাকবুক প্রো টা কেনা হবে না।

কিন্তু তাতে কী, এখন আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা সময়টা পার করছি। নিজের টাকায় নিজে চলতে পারছি। যা সারাজীবন করতে চাইতাম, সেটাই এখন কাজ, তাই কাজকে আর কাজ মনে হয় না। সাথে রয়েছে অসাধারণ এক ফ্রেন্ড সার্কেল। গাইড করার জন্য আছে মেন্টর বড় ভাইয়ারা, সার্টিফিকেটে বয়স ১৮ পার হয় নি এখনো। প্রেমও করি না, তাই কোন পিছুটানও নেই। ফ্যামিলি থেকেও বিন্দুমাত্র সমস্যা নেই আমাকে নিয়ে। যা ইচ্ছা তাই করতে পারছি। যেখানে ইচ্ছা যেতে পারছি। রিস্ক নেবার আর শেখার জন্য পারফেক্ট সময় পার করছি। আমি যদি জীবনের সবচেয়ে খুশির সময়টা পার না করি, তাহলে কে করবে।

আর সবকিছুর উপরে, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ, কারণ আমার মা এখনো বেঁচে আছেন।